রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ০৪:১৩ অপরাহ্ন

অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের দৌড়: কে কোথায় দাঁড়িয়ে

ফজলুর রহমান
  • আপডেট টাইম : বুধবার ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ১৫১ বার পঠিত

“জীবনই অভিজ্ঞতা, আর অভিজ্ঞতাই জীবন। অভিজ্ঞতার সমষ্টির নাম জীবন আর জীবনকে খন্ড থন্ড করে দেখলে এক-একটি অভিজ্ঞতা। এক-একটি অভিজ্ঞতা যেন এক এক ফোঁটা চোখের জলের রুদ্রাক্ষা। সব কটা গাঁথা হয়ে যে তসবী-মালা হয় তারই নাম জীবন। ’’-সৈয়দ মজুতবা আলী। ‘‘আপনি কি জানেন আর কি জানেন না, তা জানাটাই হলো সত্যিকারের জ্ঞান।’’ Ñকনফুসিয়াস।
অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান এর পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ কার্যসম্পর্ক রয়েছে। একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকে সবার জীবনে। তবে মিল-অমিলেরও কমতি নেই। আসুন দেখি কোনটা কী।
অভিজ্ঞতা কী: প্রাকমিক বা আদ্য জ্ঞান হলো অভিজ্ঞতা। আর অভিজ্ঞতা হলো একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে চারপাশকে উপলব্ধি করা যায়। উত্তপ্ত লোহার হাত দিলে হাত পুড়ে যাই-এই প্রজ্ঞার ভিতর দিয়ে যে বোধের জন্ম দেবে, তাই হবে অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে শিশুরা জ্বলন্ত মোমবাতি ধরতে যায়। এরপর একবার মোমবাতির শিখা ধরতে গিয়ে যে জ্ঞানের জন্ম হবে, তা শিশুর স্মৃতিতে থাকবে অভিজ্ঞতা হিসেবে। তাই দ্বিতীয় সে অভিজ্ঞতার কারণেই দ্বিতীয় বার হাত দিয়ে মোমবাতির শিখা ধরতে যাবে না।
জ্ঞান কী: দার্শনিক প্লেটো জ্ঞানকে প্রতিষ্ঠানিক ভাবে সংজ্ঞায়িত করেন ‘‘প্রমাণিত সত্য বিশ্বাস’’ হিসেবে। এর পাশাপাশি আরো সংজ্ঞা রয়েছে জ্ঞানের উপর এবং প্রচুর তত্ত্ব রয়েছে এটির অস্তিত্ব নিয়ে। জ্ঞান হলো- পরিচিতি তাকা, কোন কিছু সম্পর্কে বা কারো বিসয়ে জেনে থাকা বা বুঝে থাকা, হতে পারে কোন কিছুর প্রকৃত অবস্থা, তথ্য, বিবরণ, বা গুনাবলী সম্পর্কে জ্ঞান থাকা, যেটি অর্জিত হয়েছে উপলব্ধির মাধ্যমে, অনুসন্ধানের মাধ্যমে বা শিক্ষা গ্রহণের ফলে অভিজ্ঞা হওয়ার বা পড়াশুনা করে। জ্ঞান হচ্ছে জীবনের সেই চালক- যাকে চোখে দেখা যায় না। কিন্তু, যার সাহায্যে চোখ বন্ধ থাকলেও সব কিছুর রূপ দেখা যায় স্পষ্টভাবে। জ্ঞানর উৎপত্তি কিভাবে ঘটে? কিসের মাধ্যমে ঘটে? এসব প্রশ্নের জবাবে দার্শনিকরা ভিন্ন ভিন্ন মত প্রদান করেন। এ সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য চারটি মত হল: অভিজ্ঞতাবাদ, বুদ্ধিবান, বিচারবাদ ও স্বজ্ঞাবাদ। অভিজ্ঞতাবাদ অনুসারে, ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতাই জ্ঞান লাভের উৎস। বুদ্ধিবাদ অনুসারে, বুদ্ধিই যথার্থ জ্ঞান লাভের মাধ্যম বা উৎস। বিচারবাদ অনুসারে, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়েই জ্ঞানের উৎপত্তি। স্বজ্ঞাবাদ অনুসারে, স্বজ্ঞা বা সাক্ষাৎ প্রতীতিই যথার্থ জ্ঞান লাভের উৎস। আবার কেউ কেউ কান্ডজ্ঞান, প্রত্যাদেশ প্রভৃতিকেও জ্ঞানের উৎস বলে মনে করেন।
অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের পরস্পরা: বহুবিধ আদ্য জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় জ্ঞান। আর নানাবিধ জ্ঞানের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় প্রজ্ঞা। নানাবিধ প্রজ্ঞার ব্যবহারিক পর্যায়ে তৈরি হয় নানা ধরনের নতুন নতুন জ্ঞান। এ সবই মানুষের স্মৃতিকোষে জমা থাকে। এটা বলা হয় যে, জ্ঞানের উৎস যে-ঘটনা, তাকে যেমন অভিজ্ঞতা বলা হয়, তেমনি সেই ঘটনা থেকে পাওয়া জ্ঞানকেও অভিজ্ঞতা বলা হয়। ফল, অভিজ্ঞতামাত্রাই জ্ঞানবিশেষ বা জ্ঞান বিশেষর উৎস, কিন্তু জ্ঞানমাত্রই অভিজ্ঞতাবিশেষ বা অভিজ্ঞতাবিশেষের উৎস নয়। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ, তেমনি পার্থক্যও স্পষ্ট। এ কারণেই দেখা যায়, চাকরির আবেদনপত্রে ‘অভিজ্ঞতা’-স্থানে অতীতের কাজ উল্লেখ থাকে, জ্ঞানের বাণী নয়। অভিজ্ঞতাবাদ (ঊসঢ়রৎরপরংস) হচ্ছে জ্ঞানের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদ। এই মতবাদে বলা হয় অভিজ্ঞতাই হচ্ছে জ্ঞানের একমাত্র উৎস। যার মানে হলো- জ্ঞান সহজাত নয়, অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই মানুষ জ্ঞান লাভ করে।
দুটি উদাহরণ: একটি আঁকাবাঁকা সড়কে দ্রুত গাড়ি চালাতে নেই, বাঁকে বাঁকে বিপদ, গতিসীমা মানতে হবে, সিট বেল্ট বাঁধতে হবে-এসব বিষয়ে ধারণ রাখাটা হলো জ্ঞান। এমন সড়কে আগে গাড়ি চালানোর অভ্যাস থাকলে একটু জোরসে চালানো যেতে পারে, বাঁকগুলো বুঝে দ্রুত মোড় ঘুরানো যেতে পারে, কারণ চ্যালেঞ্জও থাকতে হয় জীবনে-এমন ধারণায় চলাটা হলো অভিজ্ঞতা। পিচ্ছিল পথ দ্রুত পার হতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেলেন- তখন আপনি সরাসরি জানলেন যে, পিচ্ছিল পথ অসতর্কভাবে দ্রুত চলতে নেই এবং এই ‘এভাবে জোরে পার হতে নেই’ এ কথা জানার নাম জ্ঞান এবং জানার আগে ‘হোঁচট খেয়ে পা মচকানোর’ ঘটনা হলো অভিজ্ঞতা।

লেখকঃ ফজলুর রহমান, কলামিস্ট, লেখক এবং সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


এ জাতীয় আরো খবর..