সোমবার, ২৭ Jun ২০২২, ১২:৩১ অপরাহ্ন

ধানের ভরা মৌসুমে চালের বাজার চড়া

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার ৩১ মে, ২০২২
  • ১২ বার পঠিত

বোরো ধানের ভরা মৌসুম এখন। কোনো কোনো জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। ধান উঠছে মোকামের বাজারগুলোয়। আর সেই ধান কিনে নিচ্ছেন ধনী ব্যবসায়ীদের স্থানীয় এজেন্টরা। কেনার পর চলে যাচ্ছে আড়তে। কারও কারও ধানের চালান চলে যাচ্ছে মিলারদের কাছে। সেখানে চাল হয়ে বস্তায় বস্তায় যাচ্ছে গুদামে। খোলাবাজারে চাল আসছে কম। আর চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের ঘাটতির পরিণামে পাল্লা দিয়ে মোকামেই বাড়ছে চালের দাম।

মোকামে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলায় চালভেদে এক লাফে কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে গত কয়েক দিনে। এসব পর্যবেক্ষণ বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

এদিকে ভরা মৌসুমে চালের দাম কেন বাড়ছে—তার কারণ দ্রুত খুঁজে বের করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাজারব্যবস্থা যাচাই করে কোন ব্যবসায়ী কিসের ব্যবসা করেন এবং যিনি যে ব্যবসার জন্য অনুমোদন নিয়েছেন, সে অনুযায়ী ব্যবসা করছেন কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে বলেছেন তিনি।

গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দিয়েছেন বলে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। কেন ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে, সে ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কেউ কেউ নিয়ম ভেঙে চালের ব্যবসায় নেমে গেছে। বড় কোম্পানির কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা রয়েছে, তারা হয়তো বিপুল পরিমাণ চাল কিনে রেখেছে।

এদিকে দেশে অনেক জায়গায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে বোরো ধানের আবাদ হওয়ায় বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও উৎপাদন বেশি হবে বলে আশা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

তবে ভরা মৌসুমে যখন চালের দাম কমার কথা, তখন চাল উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত কুষ্টিয়া ও নওগাঁর পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত শনিবার থেকে কুষ্টিয়ায় সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে এক লাফে কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা। এতে এক মাসের কম সময়ে চালের দাম কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা বাড়ল। মোকামে সব ধরনের চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব জায়গায় এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

গত শনিবার কুষ্টিয়ার চালের বাজারে অটো রাইস মিলে ভাঙানো মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৬৬-৬৭ টাকা কেজি দরে। আর সাধারণ মিনিকেট ৬৪ টাকায়। অটো রাইস মিলে ভাঙানো কাজললতা প্রতি কেজি ৫৭ টাকায়, আর কাজললতা সাধারণ ৫২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এই মিলে ভাঙানো বাসমতীর কেজি ৭৬ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা হয়েছে। আর কাটারিভোগ ৭২ টাকা, নাজিরশাইল ৭৮ টাকা এবং পাইজাম ৪৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

কুষ্টিয়া পৌর বাজারের চাল ব্যবসায়ী ধলা চাঁদ জানান, দুদিন আগে মিলগেটে যে দামে তাঁরা চাল কিনছেন, পরের দিন সে দামে আর চাল কিনতে পারছেন না। বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। এদিকে চালের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হিসেবে একশ্রেণির মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী এবং সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন সাধারণ ক্রেতারা।

কুষ্টিয়া পৌর বাজারে চাল কিনতে আসা শিক্ষক মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চালের বাজারে প্রশাসনের কোনো তদারকি নেই। এ সুযোগে মিলার এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা খেয়ালখুশিমতো চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

নওগাঁয় গত কয়েক দিনে স্থানীয় বাজারে ধানের দাম প্রতি মণে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ধানের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে চালের দাম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ কমিয়ে ব্যবসায়ীরা যে যেভাবে পারছেন ধান মজুত করছেন। ঘাটতির অজুহাতে বাড়ানো হচ্ছে চালের দাম। প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) চালের দাম ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারি বাজারের প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

নওগাঁর আলুপট্টিতে পাইকারিতে মোটা চালের দাম প্রতি কেজি (স্বর্ণা) ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা, মাঝারি (বিআর-২৮, বিআর-২৯) ৪৮ থেকে ৫২ টাকা, সরু চাল হিসেবে পরিচিত জিরা নন-শর্টার ৬০ থেকে ৬২ টাকা, জিরা শর্টার (মিনিকেট) ৬৪ থেকে ৬৬ টাকা ও কাটারি নন-শর্টার ৭০ থেকে ৭২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নওগাঁর ধান-চাল আড়তদার সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা চন্দন বলেন, কিছু বড় কোম্পানি আছে, যারা অন্য ব্যবসায় ছিলেন। তাঁরা এখন ধান-চালের ব্যবসায় চলে এসেছেন। তাঁরা বিপুল পরিমাণ ধান মজুত করছেন। কেউ কেউ মিল চুক্তি করে নিয়েছেন। ওই সব মিল থেকে সারা মৌসুম যত চাল উৎপাদন হবে, সব তাঁরা নিয়ে যাবেন। পরে সেগুলো প্যাকেট আকারে বেশি দামে বিক্রি করবেন। এসব বিষয় মিলে ধান-চাল বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। চাল ব্যবসায়ী তাজু প্রাং বলেন, মিলাররা খুচরা বাজারে চাহিদামতো সরবরাহ করছেন না। এ জন্য অবস্থা ভয়াবহ হচ্ছে।

জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার দাবি করেন, বাজারে ধানের সংকট আছে। তাই বেশি দামে ধান কিনতে হচ্ছে। ধানের হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির কারণে চাল উৎপাদনের খরচও বেড়ে গিয়েছে। চাল উৎপাদনের পর খরচ ওঠাতে দাম বাড়াতে হচ্ছে।

বর্তমানে সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেন বাংলাদেশ অটো মেজর হাসকিং রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশীদ। তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে মাঠে অনেক ধান নষ্ট হয়েছে। যে কারণে ধানের বাজার চড়া। বেশি দামে ধান কেনার কারণে চালের দামও বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. এম আসাদুজ্জামান বলেন, এখানে কয়েকটি বিষয় বোঝার আছে। ধানের ফলন কেমন হলো? যেমন রাজশাহীতে খরায় ধান পুড়ে গেছে। বন্যায় ধানের ক্ষতি হয়েছে কোথাও কোথাও। যদি উৎপাদন ৫ থেকে ১০ ভাগ কম হয়, তাহলে দাম বাড়বে। যদি উৎপাদন ঠিক থেকে থাকে, তাহলে সরবরাহে কি ঘাটতি আছে? দাম বাড়ছে দেখে কৃষক কী পরিমাণ ধান নিজের কাছে ধরে রাখছেন? যদি বাজারে ধানের সরবরাহ ঠিক থাকে, কিন্তু চাল না আসে, তাহলে বুঝতে হবে ব্যবসায়ীরা ঝামেলা করছেন। সরকারের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাদ্যমন্ত্রী তিন দিন আগেও বললেন ব্যবস্থা নেবেন। কী ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি?

কৃষি বিভাগ ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করে খুব সহজেই ধানসহ ফসলের উৎপাদন ও বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে পেতে পারত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা আছে কি না, সেটাই প্রশ্ন। যদি এখনো ওই ধরনের ব্যবস্থা না থাকে, তবে পরীক্ষামূলক হলেও এখনি শুরু করা দরকার। তাহলে দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই এর সুফল মিলবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.


এ জাতীয় আরো খবর..