শিরোনামঃ
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ ও সহযোগী ইঞ্জিনিয়ার নুরু ইসলামের প্রভাব ও সিন্ডিকেট ‘সেদিন জামিন না দিলে ওরা তারেককে মেরেই ফেলত’ ১৬ বছরের নীরব যন্ত্রণা: সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিস্ফোরক ও অশ্রুসজল জবানবন্দি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তারেক রহমান আবারও শিক্ষার হাল ধরলেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: চাঁদপুরের পাঁচ আসনে চারটিতে বিএনপি এগিয়ে, ফরিদগঞ্জে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মান, স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বর্তমান মহাপরিচালকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের অগ্রযাত্রা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি: নতুন অধ্যাদেশ অনুমোদিত চার লাইনের ব্যালটে লুকানো ৮৪ সিদ্ধান্ত: ভোটাররা কি জানেন ‘হ্যাঁ’ মানে কী? কারাফটকে থেমে গেল শেষ বিদায়: স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুতে ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম কেন প্যারোলে মুক্তি পেলেন না কারাগারের ফটকে থামানো শেষ বিদায়: বন্দি অবস্থায় স্ত্রী-সন্তানের মরদেহ দেখলেন ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ ও সহযোগী ইঞ্জিনিয়ার নুরু ইসলামের প্রভাব ও সিন্ডিকেট

#
news image

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে (সওজ) দীর্ঘদিন ধরে চলমান সিন্ডিকেট ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কার্যক্রম এখনো অব্যাহত। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান, যিনি ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকারের আমলে দুর্নীতি অনুসন্ধান ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। আজও তিনি সরকারি যন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন। তার সঙ্গে কাজ করছেন সহযোগী ইঞ্জিনিয়ার নুরু ইসলাম, যিনি সিন্ডিকেটের বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দুই কর্মকর্তা প্রশাসনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বজায় রাখার জন্য এক প্রকার জোড়াতালি প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি করেছেন, যা সরকারের দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলাকালে অসংখ্য আমলা ও রাজনীতিবিদ ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হন। এ.কে.এম আজাদ রহমানও সেই তালিকায় ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি আবারও প্রশাসনে ফিরে আসেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন লাভ করেন। প্রশাসনিক সূত্র জানায়, তার রাজনৈতিক দক্ষতা ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে নিরাপত্তা দিয়েছে, ফলে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বহাল থাকেন।

সওজের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা জানান, গত এক দশক ধরে ‘কাদের চক্র’ সড়ক উন্নয়ন খাতে নানা অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্যের মাধ্যমে বিশাল সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। এই সিন্ডিকেট তিন স্তরে বিভক্ত—বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট, অর্থপাচার সিন্ডিকেট এবং প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেট। প্রতিটি স্তরের সমন্বয়ক হিসেবে প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করেন। বিশেষ করে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান সিন্ডিকেটের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার সহযোগী নুরু ইসলাম বিভিন্ন প্রকল্প ও টেন্ডার অনুমোদনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, নুরু ইসলামের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের কার্যক্রমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহায়তা করা হয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হয়।

৫ আগস্টের পর অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রশাসনিক অনুমোদনের নামে ওই সফরগুলো মূলত অর্থ পাচারের সুপরিকল্পিত পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, ওই সফরের মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তার পরিবারের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এ.কে.এম আজাদ রহমান এই সফরের অনুমোদন ও বাস্তবায়নে প্রভাবশালী ছিলেন, যেখানে নুরু ইসলাম সরাসরি প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক সংস্কার শুরু হলেও সওজে সেই সংস্কারের চিত্র দেখা যায়নি। বরং আগের প্রভাবশালী চক্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রভাব বিস্তার করছে। বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একাধিক বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পুনঃনিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ বদলি প্রজ্ঞাপনে আসলাম নামের এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে তার স্থলে এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়েছে।

প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান দীর্ঘদিন ধরে শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ এবং আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি সেন্ট্রাল বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য এবং আইইবি নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের “সবুর-মঞ্জুর প্যানেল” থেকে কাউন্সিল মেম্বার নির্বাচিত হন। তিনি মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও ছিলেন। তার নেতৃত্বে সওজে কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে কৃত্রিম অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা হয়। এই অব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় এ.কে.এম আজাদ রহমান প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন এবং নুরু ইসলাম তার কার্যক্রমে সহায়তা করেন।

দপ্তরের একাধিক অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিন্ডিকেটের এই কৌশল—“ঠিকাদার সঙ্কট” দেখিয়ে রাস্তাঘাটের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থতা—সরকারবিরোধী অসন্তোষ সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষ যখন রাস্তাঘাটের বেহাল দশায় ভোগান্তি পোহাচ্ছে, সেই সময় সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান রক্ষায় ব্যস্ত।

ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকারের ট্রুথ কমিশনে মুখোমুখি হওয়া কর্মকর্তা এ.কে.এম আজাদ রহমান প্রশাসনে ফিরে এসে পুনঃপদায়ন প্রাপ্ত হন। নুরু ইসলাম সহ তার সহযোগীরা সিন্ডিকেটের কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালিয়ে যান। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি দুর্নীতিকে স্থায়ী করে তোলে এবং সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে।

দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেটটি তিনটি স্তরে পরিচালিত হয়। বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট প্রধান পদে নিয়োগ ও বদলির মাধ্যমে সুবিধা নিশ্চিত করে। প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেট ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ ও প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে কার্যক্রম চালায়। অর্থপাচার সিন্ডিকেট বিদেশ সফর, প্রকল্প অর্থ এবং অনুমোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচারের কার্যক্রম করে। এ.কে.এম আজাদ রহমান এই তিন স্তরের সমন্বয় করে থাকেন, নুরু ইসলাম তার কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান করেন।

সরকারি সূত্র বলছে, নতুন প্রশাসন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এ.কে.এম আজাদ রহমান এবং নুরু ইসলামের মতো কর্মকর্তাদের বিদ্যমান প্রভাব ছেঁটে ফেলা না হলে, প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়। একজন সাবেক সচিব মন্তব্য করেছেন, “যতদিন পর্যন্ত এ ধরনের কর্মকর্তারা বহাল থাকবেন, ততদিন কোনো প্রশাসনিক সংস্কার টেকসই হবে না।”

প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ.কে.এম আজাদ রহমান ও নুরু ইসলামের মতো কর্মকর্তা শুধু প্রশাসনিক সিন্ডিকেট চালান না; তারা রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবেও কাজ করেন। এ নেটওয়ার্ক সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে এবং সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা আরও জানান, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের সড়ক নেটওয়ার্কে ইচ্ছাকৃতভাবে অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট অচল হয়, প্রকল্প বিলম্ব হয় এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ তৈরি হয়। এ.কে.এম আজাদ রহমান প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে এবং নুরু ইসলাম তার সহযোগী হিসেবে এই কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

প্রশাসনিক সংস্কারের নামে বিভিন্ন দপ্তরে যখন পদায়ন, বদলি, বিদেশ সফর এবং প্রকল্প অনুমোদনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, তখন সওজে একই প্রক্রিয়া উল্টোভাবে চলছে। “সংস্কারের নামে পুনর্বাসন” এই বিভাগের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের দাবি। তাদের ভাষায়, “যেসব কর্মকর্তা সংস্কারের নেতৃত্বে আছেন, তারাই গত সরকারের সময় দুর্নীতির শীর্ষে ছিলেন। এখন তারা নিজেদের অপরিহার্য হিসেবে নতুন প্রশাসনের কাছে নিজেদের স্থাপন করছে।”

অভ্যন্তরীণ সূত্র আরও জানায়, বিদেশ সফরের অনুমোদনের মাধ্যমে সিন্ডিকেট অর্থ পাচারের কার্যক্রম চালায়। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই এবং যুক্তরাজ্যে পাঠানো এই কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এ.কে.এম আজাদ রহমান অনুমোদনকারী হিসেবে এবং নুরু ইসলাম সহযোগী হিসেবে এই কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ.কে.এম আজাদ ও নুরু ইসলামের মতো কর্মকর্তাদের বিদ্যমান প্রভাব সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তারা প্রশাসনিক সিন্ডিকেটকে টেকসই করে এবং সরকারবিরোধী পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

শেষমেষ, সওজে সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা এ.কে.এম আজাদ রহমান ও তার সহযোগী নুরু ইসলাম সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টার মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য এই দুই কর্মকর্তার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। না হলে বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সরকারি ভাবমূর্তির প্রতি জনগণের আস্থা স্থায়ীভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।

 

মো: ফয়সাল আলম

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬,  11:00 PM

news image

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে (সওজ) দীর্ঘদিন ধরে চলমান সিন্ডিকেট ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কার্যক্রম এখনো অব্যাহত। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান, যিনি ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকারের আমলে দুর্নীতি অনুসন্ধান ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। আজও তিনি সরকারি যন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন। তার সঙ্গে কাজ করছেন সহযোগী ইঞ্জিনিয়ার নুরু ইসলাম, যিনি সিন্ডিকেটের বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দুই কর্মকর্তা প্রশাসনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বজায় রাখার জন্য এক প্রকার জোড়াতালি প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি করেছেন, যা সরকারের দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলাকালে অসংখ্য আমলা ও রাজনীতিবিদ ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হন। এ.কে.এম আজাদ রহমানও সেই তালিকায় ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি আবারও প্রশাসনে ফিরে আসেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন লাভ করেন। প্রশাসনিক সূত্র জানায়, তার রাজনৈতিক দক্ষতা ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে নিরাপত্তা দিয়েছে, ফলে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বহাল থাকেন।

সওজের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা জানান, গত এক দশক ধরে ‘কাদের চক্র’ সড়ক উন্নয়ন খাতে নানা অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্যের মাধ্যমে বিশাল সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। এই সিন্ডিকেট তিন স্তরে বিভক্ত—বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট, অর্থপাচার সিন্ডিকেট এবং প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেট। প্রতিটি স্তরের সমন্বয়ক হিসেবে প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করেন। বিশেষ করে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান সিন্ডিকেটের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার সহযোগী নুরু ইসলাম বিভিন্ন প্রকল্প ও টেন্ডার অনুমোদনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, নুরু ইসলামের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের কার্যক্রমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহায়তা করা হয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হয়।

৫ আগস্টের পর অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রশাসনিক অনুমোদনের নামে ওই সফরগুলো মূলত অর্থ পাচারের সুপরিকল্পিত পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, ওই সফরের মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তার পরিবারের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এ.কে.এম আজাদ রহমান এই সফরের অনুমোদন ও বাস্তবায়নে প্রভাবশালী ছিলেন, যেখানে নুরু ইসলাম সরাসরি প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক সংস্কার শুরু হলেও সওজে সেই সংস্কারের চিত্র দেখা যায়নি। বরং আগের প্রভাবশালী চক্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রভাব বিস্তার করছে। বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একাধিক বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পুনঃনিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ বদলি প্রজ্ঞাপনে আসলাম নামের এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে তার স্থলে এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়েছে।

প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান দীর্ঘদিন ধরে শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ এবং আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি সেন্ট্রাল বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য এবং আইইবি নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের “সবুর-মঞ্জুর প্যানেল” থেকে কাউন্সিল মেম্বার নির্বাচিত হন। তিনি মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও ছিলেন। তার নেতৃত্বে সওজে কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে কৃত্রিম অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা হয়। এই অব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় এ.কে.এম আজাদ রহমান প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন এবং নুরু ইসলাম তার কার্যক্রমে সহায়তা করেন।

দপ্তরের একাধিক অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিন্ডিকেটের এই কৌশল—“ঠিকাদার সঙ্কট” দেখিয়ে রাস্তাঘাটের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থতা—সরকারবিরোধী অসন্তোষ সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষ যখন রাস্তাঘাটের বেহাল দশায় ভোগান্তি পোহাচ্ছে, সেই সময় সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান রক্ষায় ব্যস্ত।

ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকারের ট্রুথ কমিশনে মুখোমুখি হওয়া কর্মকর্তা এ.কে.এম আজাদ রহমান প্রশাসনে ফিরে এসে পুনঃপদায়ন প্রাপ্ত হন। নুরু ইসলাম সহ তার সহযোগীরা সিন্ডিকেটের কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালিয়ে যান। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি দুর্নীতিকে স্থায়ী করে তোলে এবং সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে।

দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেটটি তিনটি স্তরে পরিচালিত হয়। বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট প্রধান পদে নিয়োগ ও বদলির মাধ্যমে সুবিধা নিশ্চিত করে। প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেট ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ ও প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে কার্যক্রম চালায়। অর্থপাচার সিন্ডিকেট বিদেশ সফর, প্রকল্প অর্থ এবং অনুমোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচারের কার্যক্রম করে। এ.কে.এম আজাদ রহমান এই তিন স্তরের সমন্বয় করে থাকেন, নুরু ইসলাম তার কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান করেন।

সরকারি সূত্র বলছে, নতুন প্রশাসন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এ.কে.এম আজাদ রহমান এবং নুরু ইসলামের মতো কর্মকর্তাদের বিদ্যমান প্রভাব ছেঁটে ফেলা না হলে, প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়। একজন সাবেক সচিব মন্তব্য করেছেন, “যতদিন পর্যন্ত এ ধরনের কর্মকর্তারা বহাল থাকবেন, ততদিন কোনো প্রশাসনিক সংস্কার টেকসই হবে না।”

প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ.কে.এম আজাদ রহমান ও নুরু ইসলামের মতো কর্মকর্তা শুধু প্রশাসনিক সিন্ডিকেট চালান না; তারা রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবেও কাজ করেন। এ নেটওয়ার্ক সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে এবং সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা আরও জানান, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের সড়ক নেটওয়ার্কে ইচ্ছাকৃতভাবে অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট অচল হয়, প্রকল্প বিলম্ব হয় এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ তৈরি হয়। এ.কে.এম আজাদ রহমান প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে এবং নুরু ইসলাম তার সহযোগী হিসেবে এই কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

প্রশাসনিক সংস্কারের নামে বিভিন্ন দপ্তরে যখন পদায়ন, বদলি, বিদেশ সফর এবং প্রকল্প অনুমোদনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, তখন সওজে একই প্রক্রিয়া উল্টোভাবে চলছে। “সংস্কারের নামে পুনর্বাসন” এই বিভাগের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের দাবি। তাদের ভাষায়, “যেসব কর্মকর্তা সংস্কারের নেতৃত্বে আছেন, তারাই গত সরকারের সময় দুর্নীতির শীর্ষে ছিলেন। এখন তারা নিজেদের অপরিহার্য হিসেবে নতুন প্রশাসনের কাছে নিজেদের স্থাপন করছে।”

অভ্যন্তরীণ সূত্র আরও জানায়, বিদেশ সফরের অনুমোদনের মাধ্যমে সিন্ডিকেট অর্থ পাচারের কার্যক্রম চালায়। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই এবং যুক্তরাজ্যে পাঠানো এই কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এ.কে.এম আজাদ রহমান অনুমোদনকারী হিসেবে এবং নুরু ইসলাম সহযোগী হিসেবে এই কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ.কে.এম আজাদ ও নুরু ইসলামের মতো কর্মকর্তাদের বিদ্যমান প্রভাব সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তারা প্রশাসনিক সিন্ডিকেটকে টেকসই করে এবং সরকারবিরোধী পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

শেষমেষ, সওজে সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা এ.কে.এম আজাদ রহমান ও তার সহযোগী নুরু ইসলাম সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টার মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য এই দুই কর্মকর্তার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। না হলে বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সরকারি ভাবমূর্তির প্রতি জনগণের আস্থা স্থায়ীভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।